রবিবার, ৪ অক্টোবর ২০২৬
প্রথম পাতা » পরিবেশ » জলবায়ু ও পরিবেশ অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের বড় অর্জন, সেরার মুকুট আইমানের
জলবায়ু ও পরিবেশ অলিম্পিয়াডে বাংলাদেশের বড় অর্জন, সেরার মুকুট আইমানের

রাশিয়ার সিরিয়াস ফেডারেল টেরিটরিতে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল অলিম্পিয়াড অন ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইস্যুজ (আইওসিই) ২০২৬-এ সাফল্যের স্বাক্ষর রেখেছে বাংলাদেশ। প্রতিযোগিতার ব্যক্তিগত বিভাগে বাংলাদেশের শিক্ষার্থীরা পেয়েছে একটি স্বর্ণপদক, দুটি ব্রোঞ্জপদক ও একটি সম্মানসূচক স্বীকৃতি। এর মধ্যে সিলেটের জালালাবাদ ক্যান্টনমেন্ট ইংলিশ স্কুল অ্যান্ড কলেজের (জেসিইএসসি) নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী আবু মাহজুরাহ আইমান সর্বোচ্চ নম্বর অর্জন করে প্রতিযোগিতার সার্বিক বিজয়ী হয়েছে। একই সঙ্গে তার ঝুলিতে উঠেছে স্বর্ণপদক।
জেসিইএসসির নবম শ্রেণির আরেক শিক্ষার্থী এস এম আনফাল হাবিব এবং ভিকারুননিসা নূন স্কুল অ্যান্ড কলেজের দ্বাদশ শ্রেণির শিক্ষার্থী ফাবিহা নুরজিনা পেয়েছে ব্রোঞ্জপদক। একই প্রতিষ্ঠানের নবম শ্রেণির শিক্ষার্থী ইসমাহ আরুশ অর্জন করেছে সম্মানসূচক স্বীকৃতি।
এবারের আইওসিই অনুষ্ঠিত হয় ২০ থেকে ২৯ সেপ্টেম্বর রাশিয়ার সিরিয়াস ফেডারেল টেরিটরিতে। প্রতিযোগিতা শেষে বাংলাদেশের প্রতিনিধিদল বৃহস্পতিবার দেশে ফেরে। এতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীরা অংশগ্রহণ করে।
আয়োজনটি শুধু লিখিত পরীক্ষাকেন্দ্রিক ছিল না; বরং মাঠে গিয়ে নমুনা সংগ্রহ, গবেষণা, ল্যাবরেটরিতে নমুনা পরীক্ষা, এককভাবে সমস্যা সমাধান এবং দলীয় বৈজ্ঞানিক কর্মকাণ্ড—সব মিলিয়ে প্রতিযোগিতাটির পরিসর ছিল বেশ বিস্তৃত।
আইওসিইর মূল প্রতিযোগিতা দুই ভাগে বিভক্ত ছিল—তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক। তাত্ত্বিক অংশে প্রত্যেক প্রতিযোগীকে এককভাবে পরীক্ষা দিতে হয়েছে। অন্যদিকে ব্যবহারিক অংশে মাঠপর্যায়ের অনুসন্ধানের সঙ্গে পরীক্ষাগারে সংগৃহীত নমুনার বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ যুক্ত ছিল।
ব্যবহারিক পরীক্ষার মাঠপর্যায়ের কার্যক্রম পরিচালিত হয় রোজা খুতরের পার্বত্য প্রাকৃতিক পরিবেশে। সেখানে শিক্ষার্থীদের নিজেদের পূর্বজ্ঞান কাজে লাগানোর পাশাপাশি সরাসরি প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্র পর্যবেক্ষণ করে গবেষণাভিত্তিক পদ্ধতিতে বিভিন্ন তথ্য সংগ্রহ করতে হয়েছে।
এ সময় প্রতিযোগী দলগুলো উদ্ভিদের বিন্যাস ও জীববৈচিত্র্য পর্যবেক্ষণ করে। বিভিন্ন প্রজাতির উপস্থিতি, বিস্তার ও প্রাচুর্যও নথিভুক্ত করা হয়। পাশাপাশি ভূপ্রকৃতি ও মাটির বৈশিষ্ট্য পরীক্ষা এবং মানুষের কর্মকাণ্ডের কারণে পরিবেশের ওপর পড়া প্রভাব শনাক্ত করার কাজ করা হয়। পরবর্তী পরীক্ষাগার পরীক্ষার জন্য মাটি ও পানির নমুনাও সংগ্রহ করতে হয়েছে।
মাঠের অনুসন্ধান শেষ হওয়ার পর সংগ্রহ করা নমুনা নিয়ে কাজ করা হয় সিরিয়াসের পরীক্ষাগারে। সেখানে পানি ও মাটির নমুনায় পিএইচ, খনিজায়ন, নাইট্রেট, ফসফেট, লোহা ও পানির কঠোরতাসহ বিভিন্ন মানদণ্ড পরীক্ষা করা হয়। পরীক্ষার ফল পরিবেশগত মানের সঙ্গে মিলিয়ে দেখে সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের বাস্তুতন্ত্রের পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করতে হয়েছে অংশগ্রহণকারীদের।
অর্থাৎ ব্যবহারিক পর্বে একটি বৈজ্ঞানিক গবেষণার প্রায় পুরো প্রক্রিয়াই অনুসরণ করতে হয়েছে শিক্ষার্থীদের। প্রাকৃতিক পরিবেশ পর্যবেক্ষণ ও তথ্য সংগ্রহ থেকে শুরু করে নমুনা নেওয়া, ল্যাবরেটরি পরীক্ষা এবং শেষ পর্যন্ত বাস্তুতান্ত্রিক পরিস্থিতির ব্যাখ্যা—প্রতিটি ধাপই ছিল মূল্যায়নের অংশ।
তাত্ত্বিক অংশের চ্যালেঞ্জ ছিল আবার সম্পূর্ণ আলাদা। প্রতিটি শিক্ষার্থীকে বাস্তব জীবনের একটি পরিবেশগত সমস্যা বেছে নিয়ে স্বাধীনভাবে তার সমাধান নিয়ে কাজ করতে হয়েছে। এবারের প্রতিযোগিতার জন্য বিভিন্ন বৈজ্ঞানিক, শিক্ষা, সংরক্ষণ ও শিল্পসংশ্লিষ্ট সহযোগী প্রতিষ্ঠানের সহায়তায় একাধিক সমস্যা প্রস্তুত করা হয়েছিল।
প্রশ্নগুলোতে জলবায়ু পরিবর্তনকে গুরুত্ব দেওয়া হলেও সেগুলোর বিষয়বস্তু শুধু জলবায়ুর মধ্যেই সীমাবদ্ধ ছিল না। বনজ বাস্তুতন্ত্র রক্ষা, প্রাকৃতিক সম্পদের ব্যবহার, জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ এবং পরিবেশ ব্যবস্থাপনার মতো বিষয়ও সমস্যাগুলোর অন্তর্ভুক্ত ছিল।
এখানে শুধু তথ্য জানা বা মুখস্থ জ্ঞান দিয়ে ভালো করার সুযোগ ছিল না। প্রতিযোগী কোনো সমস্যাকে কতটা যথাযথভাবে চিহ্নিত করতে পারছে, তার দেওয়া সমাধান বাস্তবে কতটা কার্যকর, যুক্তিগুলো কতটা সুশৃঙ্খল এবং প্রস্তাবে মৌলিকতা ও উদ্ভাবনী চিন্তার কতটা প্রকাশ ঘটছে—এসব বিষয়ও মূল্যায়নে গুরুত্ব পেয়েছে।
বাংলাদেশ দলের দলনেতার দায়িত্বে ছিলেন তাসিন মোহাম্মাদ ও আহনাফ তাহমিদ উদ্দিন। তাদের সঙ্গে পর্যবেক্ষক হিসেবে ছিলেন ফেরদৌস আহমেদ।
আন্তর্জাতিক এই প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের অংশগ্রহণের ভিত্তি তৈরি হয় বাংলাদেশ অলিম্পিয়াড অন ক্লাইমেট চেঞ্জ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল ইস্যুজ (বিওসিই) ২০২৬-এর মাধ্যমে। বিওসিইর আয়োজন করে সাসটেইনেবিলিটি অ্যান্ড লাইফ সায়েন্সেস নেটওয়ার্ক (এসএলএসএন) ও জিরো কম্পিটিশনস।
বিওসিই ২০২৬-এর বাছাই কার্যক্রমের সূচনা হয় ১৭ জুলাই দেশব্যাপী প্রাথমিক পর্বের মধ্য দিয়ে। এতে চার হাজারের বেশি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী অংশ নেয়। এরপর অনুষ্ঠিত হয় দেশব্যাপী আঞ্চলিক পর্ব ও অনলাইন আঞ্চলিক পর্ব। এসব ধাপ পেরিয়ে নির্বাচিত ৩০০ শিক্ষার্থী ২১ আগস্ট ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কার্জন হলে জাতীয় পর্বে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে।
এরপর প্রশিক্ষণ ও চূড়ান্ত দল বাছাইয়ের জন্য নেওয়া পরীক্ষার মাধ্যমে আইওসিই ২০২৬-এর বাংলাদেশ দল গঠন করা হয়।
বাছাই থেকে শুরু করে প্রশিক্ষণ ও প্রস্তুতির পুরো প্রক্রিয়ায় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সম্পৃক্ততা ছিল। বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগ এবং দুর্যোগ বিজ্ঞান ও জলবায়ু সহনশীলতা বিভাগের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন পর্যায়ে এ কার্যক্রমে সহযোগিতা করেন। বিওসিইর একাডেমিক উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ড. কাজী মতিন উদ্দিন আহমেদ।
আইওসিইর মাঠপর্যায়ের গবেষণা, পরীক্ষাগারভিত্তিক পরীক্ষা এবং তাত্ত্বিক সমস্যার সমাধানের জন্য নির্বাচিত শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন বিষয়ে প্রস্তুতি দেওয়া হয়। এর মধ্যে ছিল বাস্তুবিদ্যা, জীববৈচিত্র্য, পরিবেশ রসায়ন, জলবায়ুবিজ্ঞান, পৃথিবীব্যবস্থা, ভূতত্ত্ব ও দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা।
দেশে চার হাজারের বেশি শিক্ষার্থীকে নিয়ে শুরু হওয়া প্রতিযোগিতার বাছাই ও প্রস্তুতির দীর্ঘ পথ পেরিয়ে শেষ পর্যন্ত আন্তর্জাতিক মঞ্চে সার্বিক বিজয়ী হওয়ার পাশাপাশি বাংলাদেশ অর্জন করেছে একটি স্বর্ণপদক, দুটি ব্রোঞ্জপদক এবং একটি সম্মানসূচক স্বীকৃতি।
বাংলাদেশের এই সাফল্যকে শুধু কয়েকটি পদক অর্জনের মধ্য দিয়ে দেখার সুযোগ নেই। বাস্তব বাস্তুতন্ত্রে গবেষণা, মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ, পরীক্ষাগারে বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণ এবং আন্তর্জাতিক মানের জটিল পরিবেশগত সমস্যা সমাধানের মতো কঠিন ধাপ পেরিয়ে শিক্ষার্থীদের এই অর্জন জলবায়ু ও পরিবেশবিজ্ঞানে বাংলাদেশের তরুণ প্রজন্মের সক্ষমতা ও সম্ভাবনার একটি উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত তৈরি করেছে।






জলবায়ু ট্রাস্টের ১০১ প্রকল্পের পূর্ণাঙ্গ তথ্য চাইল সংসদীয় কমিটি
কৃষিকাজের সূচনা হয়েছিল কতদিন আগে?
বাড়বে শীত, টানা ২দিন বৃষ্টির সম্ভাবনা
রাতে তাপমাত্রা বাড়বে
‘প্রাকৃতিক সমস্যা মানব সৃষ্ট’
বায়ুদূষণে বিশ্বের শীর্ষে বাংলাদেশ 